বৃহস্পতিবার, ১৮ অগাস্ট ২০২২, ০১:৩৪ অপরাহ্ন

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার মঙ্গলবাড়িয়ায় ১শ কোটি টাকা লিচু বিক্রির আশা

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার মঙ্গলবাড়িয়ায় ১শ কোটি টাকা লিচু বিক্রির আশা

আমিনুল হক সাদী, কিশোরগঞ্জ:
জ্যৈষ্ঠ মাসের মিষ্টি ফলের সমারোহ আর মৌ মৌ গন্ধ জানান দেয় এটা মধুমাস। আম, কাঁঠাল, লিচু, আনারস আর জামের সমারোহ এখন গ্রামে গ্রামে। পাকুন্দিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজারগুলোতে মৌসুমী ফল ক্রয়-বিক্রয়ে এখন উৎসবের আমেজ। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের লিচু দেশের অন্যতম সেরা। এই লিচু রসে টুইটম্বুর। স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়। খেতে সুস্বাদু। আকারে বড়। বাতাসের তালে, গাছের পাতার ফাঁকে লাল হয়ে দোলছে আর দোলছে। দেখে যেন জিভে জল এসে যায়।
‘পুকুরের ঐ কাছে না/লিচুর এক গাছ আছে না/হোথা না আস্তে গিয়ে/য়্যাব্বড় কাস্তে নিয়ে/গাছে গো যেই চড়েছি/ছোট এক ডাল ধরেছি’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই লিচু চোরের কবিতাটির মতো মঙ্গলবাড়িয়া নামে একটি গ্রাম দেখা গেল। মিল পাওয়া গেল সেই কবিতার চরিত্রের কিছু লোকেরও। কিছু বাচ্চা-কাচ্ছা গাছে লিচুর জন্য ঢিল ছুঁড়ছে আর লিচু গাছের মালিক তেড়ে এসে দৌড়ানি দিচ্ছে।
বাজারে অনেক জাতের লিচু উঠলেও লোকজনের চোখ থাকে কিশোরগঞ্জের মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর দিকে। এ সুযোগে ব্যবসায়ীরাও যেকোনো লিচুকেই মঙ্গলবাড়িয়ার বলে চালাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু বাজারে খুব একটা পাওয়া যায় না। বাগান থেকেই কাড়াকাড়ি করে নিয়ে যায় লোকজন। রসালো, সুমিষ্ট, সুন্দর গন্ধ ও গাঢ় লাল রঙের বৈশিষ্ট্যের কারণে মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর খ্যাতি দেশজুড়ে। এবার এ লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। তাই জেলার পাকুন্দিয়া পৌর এলাকার মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের বাগানগুলোতে ‘লিচুবিলাসীদের’ আনাগোনা বেড়ে গেছে।
মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের সবচেয়ে বড় লিচু চাষি তৌহিদুর রহমান। তার ১২৮টি লিচু গাছ আছে। এবার ফলন ভালো হওয়ায় কয়েক লাধিক টাকার লিচু বেচবেন বলে আশা করছেন।
বাজারের সাধারণ ১০০ লিচু ২০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও মঙ্গলবাড়িয়া লিচু দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। চাষিদের মতে প্রতিটি গাছে ১০ থেকে ১২ হাজার লিচু উৎপন্ন হয়ে থাকে এবং একেক মৌসুমে মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে প্রায় তিন কোটি টাকার মতো লিচু বিক্রি হয়ে থাকে। লিচু চাষিরা জানিয়েছে, লিচুর জন্য ফরিয়া ব্যবসায়ীরা আগাম টাকা দিয়ে রেখেছে তাদের। শুধু দেশে নয়, বিদেশে আত্মীয়স্বজনের কাছেও পাঠানো হচ্ছে এ লিচু। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে অন্তত ছয় থেকে সাত হাজার লিচু গাছ আছে। এসব লিচু বাগানে প্রায় শত কোটি টাকার লিচু বিক্রি হবে বলে তাদের আশা।
প্রায় ২০০ বছর আগে এ গ্রামে লিচু চাষ শুরু হয় বলে জানা যায়। পরে তা পুরো গ্রাম এমনকি আশপাশেও ছড়িয়ে পড়ে। সাফল্য দেখে অনেক কৃষক ধানি জমিতেও লিচুর বাগান গড়ে তুলেছে।
মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের মোহাম্মদ আলী সবুজ জানান, কেবল কিশোরগঞ্জ নয়, দেশের অন্যান্য জেলায়ও মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর বাড়তি চাহিদা রয়েছে। আর এ কারণেই লিচুর মৌসুমে স্থানীয় বাজারে এসব লিচু পাওয়া যায় না। চলে যায় দেশের বড় বড় জনবহুল শহরে। দামও অন্য জাতের লিচুর চেয়ে বেশি। মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু আকারে যেমন বড় হয়, রঙে, স্বাদে-গন্ধেও হয় ব্যতিক্রমী গুণের অধিকারী। যে কারণে মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর একটি বাড়তি কদর ও চাহিদা রয়েছে।
পাইকাররা এখান থেকে লিচু কিনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যায়। যে ১শ’ লিচু আগে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা শ’ দরে বিক্রি হত সেই লিচু এখন ৩শ’ থেকে ৪শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ লিচু কেনার জন্য পাইকারদের পাশাপাশি প্রতিদিন এলাকায় প্রাইভেটকারেও চলে আসছেন অভিজাত গ্রাহকরা। এছাড়াও সিঙ্গাপুর, কুয়েত, সৌদি আরব, মালোশিয়া, লন্ডন, আমেরিকা, জার্মান, অস্ট্রেলিয়া, সহ বাংলাদেশি প্রবাসীদের কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে মঙ্গলবাড়িয়ার এ সুস্বাদু লিচু।
স্থানীয়রা জানায়, ব্রিটিশ আমলে এ গ্রামের জনৈক দারোগা সদূর চীন থেকে এই জাতের লিচু সর্বপ্রথম রোপণ করেন। এরপর থেকে এ লিচুর স্বাদ, গন্ধ, সুস্বাদু দেখে পুরো মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে লিচু চাষ। এ গ্রামের অনেকেই লিচু চাষে এখন স্বাবলম্বী। গ্রামের শতাধিক লিচু চাষির সহস্রাধিক লিচু গাছ রয়েছে।
মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতেই কমবেশি লিচু গাছ রয়েছে। দিনদিন এর ব্যাপকতা বেড়েই চলছে। মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর সঠিক জাত জানা সম্ভব হয়নি। তবে গ্রামের নামানুসারে একে ‘মঙ্গলবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী লিচু বলে দেশ বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছে। তবে কিছু লিচু বাগানের চাষীরা জানিয়েছে তাদের লিচুতে পোকার প্রাদুর্ভাব বেশি। অনেক লিচু সুন্দর দেখালেও ভেতরে রয়েছে ছোট্্র পোকা। যে কারণে তারা লিচু নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোঃ আৎ সাত্তার বলেন, আমি কিশোরগঞ্জে যোগদানের পরই মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুবাগনগুলো পরিদর্শন করে অভিভূত হয়েছি। মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুবাগানগুলোতে কৃষকরা কোনো ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করে না। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে এর রোগবালাই দমন করেন তারা। এ কারণেও হয়তো এ লিচুর এত জনপ্রিয়তা। তাছাড়া এখানকার লিচু বাজারে বিক্রি করতে হয় না গ্রাম থেকেই পাইকার এসে নিয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, লিচুতে পোকা মাকড়েরর প্রাদুর্ভাব থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে এই গ্রামের লিচুর আবাদ দেখে অন্যন্যা এলাকার শিক্ষিত মানুষ এখন লিচু চাষে ঝুকছে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © 2021
Design By Rana