মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২, ০৮:৫৭ অপরাহ্ন

হঠাৎ বাজার থেকে উধাও সয়াবিন তেল

হঠাৎ বাজার থেকে উধাও সয়াবিন তেল

একুশে ডেস্ক:
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানিয়েছেন দেশে ভোগ্যপণ্যের কোনো সঙ্কট নেই। ভোক্তা অধিদফতরের তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে যে পরিমাণে সয়াবিন-পামওয়েলসহ ভোজ্য তেল মজুদ রয়েছে তাতে আগামী তিন থেকে চার মাস বাজারে কোনো সঙ্কট হওয়ার কথা নয়। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে তো ভোজ্য তেলের বাজার ও মূল্য স্বাভাবিক থাকার কথা, কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। দফায় দফায় দাম বেড়ে ভোজ্য তেলের বাজার টালমাটাল অবস্থা।
এখন আবার দেখা দিয়েছে বাজারে ভোজ্য তেলের চরম সঙ্কট। বাজার থেকে খোলা সয়াবিন তেল একরকম উধাও হয়ে গেছে। এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলও মিলছে না সব দোকানে। আবার অনেক দোকানদার সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। সব মিলিয়ে সিন্ডিকেটের কারণে এখন ভোজ্য তেলের বাজারে চরম অরাজকতা বিরাজ করছে বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা।
কাস্টমসের তথ্যমতে, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) বীজ মাড়াই ও সরাসরি অপরিশোধিত সয়াবিনের সরবরাহ ছিল ৫ লাখ ৯০ হাজার টন। গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৫ লাখ ৭৮ হাজার টন। অর্থাৎ গত বছরের চেয়েও ১২ হাজার টন বেশি সরবরাহ রয়েছে এ বছর। মূলত এই সময়ের মধ্যে যেসব সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে সেগুলোই এখন বাজারে রয়েছে। সুতরাং বাণিজ্য মন্ত্রী, ভোক্তা অধিদফতর ও আমদানি তথ্য মতে প্রকৃত অর্থেই দেশের বাজারে ভোজ্য তেলের কোনো সঙ্কট হওয়ার কথা নয়।
তাহলে বাজারে সয়াবিন-পামওয়েলসহ ভোজ্য তেলের এত হাহাকার কেন। এর জবাবও মিলল জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের অনুসন্ধানে। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ভোক্তা অধিদফতর ভোজ্য তেলের চলমান সঙ্কটের আসল কারণ অনুসন্ধানে নামে। এ জন্য গত কয়েক দিন ভোজ্য তেলের আমদানিকারক বা মিল মালিক, পাইকারি বাজার এবং খুচরা বাজারে ব্যাপক অভিযান চালান প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। এতে যে চিত্র ফুটে উঠেছে তাতে দেখা যায়, ভোজ্য তেলের বাজারে অস্থিরতার মূলে রয়েছে মিল মালিক পাইকারি ব্যবসায়ীদের কারসাজি। কারণ এই দুই পর্যায়ে সরকার ভোজ্য তেলের যে মূল্য বেঁধে দিয়েছে তার চেয়ে ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি দরে বিক্রি করা হচ্ছে।
  সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ও অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের নেতৃত্বে একটি টিম টিকে গ্রুপের কারখানায় অভিযানে যায়। এ সময় দেখা যায়, টিকে গ্রুপের কারখানা থেকে প্রতি লিটার পামওয়েল বিক্রি করা হচ্ছে ১৩৮ থেকে ১৪০ টাকায়। অথচ সরকার খুচরা পর্যায়ে প্রতি লিটার পামওয়েলের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে ১৩৩ টাকা।
অভিযানকালে দেখা যায়, অধিদফতরের টিম টিকে গ্রুপ কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চায় তারা, তাদের আমদানি মূল্য বা প্রতি লিটারে খরচ কত হয়। কাগজপত্র ভ্যাট চালান ঘেঁটে দেখা যায়, তেলের আমদানি মূল্য ও ১৫ শতাংশ ভ্যাটসহ অন্যান্য খরচ মিলে লিটারপ্রতি তাদের খরচ পড়ে ১২৫ টাকা। লিটারে তাদের ১-২ টাকা লাভে বিক্রি করার কথা। অর্থাৎ মিল পর্যায়ে ১২৭-১২৮ টাকা বিক্রয়মূল্য হওয়ার কথা, অথচ তারা বিক্রি করছে ১৩৮ টাকা ৫৭ পয়সায়। লিটারে মিল মালিকরাই কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি দরে বিক্রি করছে।
অভিযানকালে আরও দেখা যায়, মিল থেকে কত টাকা দরে ভোজ্য তেল বিক্রি করা হচ্ছে, সে বিক্রয় রসিদও দেওয়া হচ্ছে না ট্রাকের সঙ্গে। অর্থাৎ বিক্রয়মূল্য গোপন রাখা হয়। ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বেশি তফাৎ হওয়ায় ও পণ্য বিক্রি রসিদ না দেওয়ায় টিকে গ্রুপের ওই কারাখানাকে ভোক্তা অধিদফতর দেড় লাখ টাকা জরিমানা করে।
মিল থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা প্রতি লিটার পামওয়েল ১৩৮ টাকায় কিনে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন ১৫৮ থেকে ১৬০ টাকায়। আর খুচরা বিক্রেতারা ভোক্তার কাছে বিক্রি করছেন ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকায়। অর্থাৎ ১২৫ টাকার আমদানি করা পামওয়েল ভোক্তার থলেতে যাচ্ছে ১৭০ টাকায়। মাঝখান থেকে তিন পর্যায়ের ব্যবসায়ী নামের এই অসাধু চক্র লুফে নিচ্ছে লিটারে ৪৫ টাকা। অথচ নিয়ম অনুযায়ী শতকরা ১০ ভাগ লাভে বিক্রি করলে তিন পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ টাকা বেশিতে ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর কথা এক লিটার পামওয়েল। তার মানে এই ব্যবসায়ী চক্র ভোক্তার কাছ থেকে লুটে নিচ্ছে বাড়তি ৩০ থেকে ৩২ টাকা।
এর পর ভোক্তা অধিদফতরের একই টিম আরেক দিন অভিযান চালায় মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের পাইকারি দোকানে। সেখানে দেখা যায় খোলা সয়াবিন প্রতি লিটার সরকারি বিক্রয়মূল্য ১৪৩ টাকা। অথচ এ বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীরা মিল থেকে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিনই কিনছেন ১৫৩ টাকায়। অর্থাৎ এখানেও মিল পর্যায়েই লিটারে ১০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। পাইকারি বিক্রেতারা এই ১৫৩ টাকার সয়াবিন বিক্রি করছেন যে যার ইচ্ছামতো। কেউ বিক্রি করছেন ১৭০ টাকায়, কেউ বিক্রি করছেন ১৭৮ টাকায়। তাদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতারা কিনে সেটি ভোক্তার কাছে বিক্রি করছেন ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায়।
এসব বিষয়ে মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার সময়ের আলোকে বলেন, ‘দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে নামার সিদ্ধান্ত নেয় ভোক্তা অধিদফতর। এর জন্য আমরা প্রথমে একেবারে মহল্লার মুদি দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক মাঝারি পাইকারি ব্যবসায়ী, এরপর বড় পাইকারি ব্যবসায়ী এবং সর্বশেষ আমদানিকারক বা মিল পর্যায়ে অভিযান চালাই। আমরা রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও মোহাম্মদপুর কৃষি বাজারের বেশ কয়েকজন পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীর কাছে তাদের ক্রয়মূল্যের রসিদ চাই।
প্রথমে তারা দিতে না চাইলেও আমরা তাদের ক্রয়মূল্যের কাগজ জব্দ করি। এতে দেখা যায়, সরকার পামওয়েল ও সয়াবিনের যে খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে তার চেয়ে লিটারে ১০ থেকে ১২ টাকা বেশিতে বিক্রি করা হচ্ছে মিল থেকেই। তখন আমরা বুঝলাম ঘাপলাটা শুরু হচ্ছে একেবারে মিল পর্যায় থেকে। এরপর আমরা সিদ্ধান্ত নিই মিলে অভিযান চালানোর। টিকে গ্রুপের মিলে গিয়ে দেখি আসলেই মিল থেকে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। পরে প্রত্যেক ধাপে বাড়তি দামে বিক্রি হয়ে চড়া মূল্যে ভোজ্য তেল যাচ্ছে ভোক্তার হাতে। আমরা এই সিন্ডিকেট ভাঙতে চাই। এজন্য একেবারে গোড়ায় হাত দিয়েছি। আগামী এক সপ্তাহ আমরা আরও ব্যাপকহারে অভিযান চালাব। আশা করি, এর সুফল পাবেন ভোক্তারা। হঠাৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণ : বাজারে খোলা সয়াবিন এখন নেই বললেই চলে। মিল মালিকরা একেবারে বন্ধ করে দিয়েছেন পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে ভোজ্য তেল বিক্রি।
এ বিষয়ে জানতে গতকাল রাজধানীর বেশ কয়েকটি পাইকারি বাজারে অনুসন্ধান চালান এ প্রতিবেদক। কারওয়ান বাজারের এক পাইকারি ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের আলোকে বলেন, ‘মিল মালিকরা আমাদের মতো প্রকৃত পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে মিল থেকে সয়াবিন এবং পামওয়েল বিক্রি করছে না। তারা এসও (সেলস অর্ডার) বা ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) চড়া দামে বিক্রি করে দিচ্ছে রাজধানীর মৌলভীবাজারের বড় বড় পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে। তাদের কেউ তেল নিয়ে গুদামজাত করে অল্প অল্প ছাড়ছে বাজারে, আবার কেউ টাকা শোধ করে মিলেই রেখে দিচ্ছে তেল। পরে আরেক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তারা সেগুলো আরও চড়া দামে বিক্রি করছে বাজারে। মিল মালিকরা মূলত আমাদের মতো পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে ভোজ্য তেল না দেওয়ায় বাজারে তেলের সঙ্কট তৈরি হয়েছে। অথচ তাদের গুদাম চেক করলে দেখা যাবে, সেখানে তেলের কোনো অভাব নেই। মূলত এ কারণেই বাজারে ভোজ্য তেলের সঙ্কট।
১ ও ২ লিটারের বোতল বিক্রি করছেন না অনেক দোকানদার : অন্যদিকে খোলা সয়াবিনের মতোই বোতলজাত সয়াবিনেরও চরম সঙ্কট রয়েছে বাজারে। অনেক দোকানদার বোতলজাত ১ লিটার ও ২ লিটার সয়াবিন বিক্রি করছেন না ক্রেতার কাছে। তাছাড়া অনেক দোকানদার তেল বিক্রিই বন্ধ করে রেখেছেন এখন।
কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতা ইউসুফ জেনারেল স্টোরের মালিক মো. ইউসুফ সময়ের আলোকে বলেন, ‘এমনিতেই তেলের সরবরাহ কম, তার ওপর দামও বেশি। তেল বিক্রি করতে গিয়ে একটু এদিক-ওদিক হলেই সরকারি লোক এসে জরিমানা করছে। এসব কারণে ভোজ্য তেল আপাতত দোকানে ওঠাচ্ছি না। এ কারণে আমার অনেক ক্রেতা ছুটে যাচ্ছে, তারপরও কিছু করার নেই।’

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © 2021
Design By Rana