সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১০:১৫ পূর্বাহ্ন

সন্তান লালনপালনে ইসলামের নির্দেশনা

সন্তান লালনপালনে ইসলামের নির্দেশনা

পবিত্র কুরআনের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে মহান আল্লাহর নেয়ামতরাজির বিস্তারিত বিবরণ। আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করে তাদেরকে অসংখ্য অগণিত নেয়ামত দান করেছেন। পৃথিবীর সব মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেও সেসব নেয়ামত গণনা করে শেষ করতে পারবে না। এসব নেয়ামতের মধ্যে অন্যতম একটি নেয়ামত ‘সুসন্তান’।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদেরই মধ্য হতে তোমাদের জন্য স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের স্ত্রীদের থেকে তোমাদের জন্য পুত্র-পৌত্রাদি সৃষ্টি করেছেন। আর ভালো ভালো জিনিসের থেকে রিজিকের ব্যবস্থা করেছেন; তবুও কি তারা ভিত্তিহীন জিনিসের প্রতি ঈমান রাখবে আর আল্লাহর নেয়ামতগুলোর অকৃতজ্ঞতা করবে?’ (সুরা নাহল : ৭২)। মানবশিশু মানবজাতির অতীব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিশুরা নিষ্পাপ, শিশু পবিত্রতার প্রতীক। শৈশবেই মানুষের জীবনের গতিপথ নির্ধারিত হয়। তাই ইসলাম শৈশবকালকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তাই প্রতিটি বাবা-মায়ের উচিত সন্তানদের শৈশবকাল থেকেই ইসলামি ভাবধারায় গড়ে তোলা। সন্তান লালনপালনের ক্ষেত্রে জরুরি কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো।
আজান ও ইকামত : বাচ্চা জন্মের পর তার ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামত দেওয়া সুন্নত। এ
ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘হাসান (রা.) জন্মের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজের আজান-ইকামতের মতো তার ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামত দিলেন।’ (তিরমিজি : ১/২৭৮)
সুন্দর নাম রাখা : বাচ্চা জন্মের ৭ দিনের মাথায় তার জন্য সুন্দর অর্থবহ একটি নাম রাখা সুন্নত। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশু জন্মের ৭ দিনের মাথায় তার নাম রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।’ (আবু দাউদ : ২/৩৬)
আকিকা করা : সম্ভব হলে শিশু জন্মের ৭ দিনের মাথায় তার আকিকা করা। আর সম্ভব না হলে, ১৪ কিংবা ২১ দিনের ভেতরে তার আকিকা করা। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক শিশু তার আকিকার সঙ্গে বন্ধক থাকে। তাই জন্মের ৭ দিনের মাথায় তার আকিকা করা এবং মাথা কামিয়ে দেওয়া ও তার নাম রাখা।’ (ইবনে মাজা : ২২৮)
আদর ও চুম্বন করা : ছোট ছোট ফুলকলি শিশু-সন্তানদের আদর-যত্ন করা এবং তাদেরকে মাঝেমধ্যে চুম্বন করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানদের আদর করতেন ও চুম্বন করতেন। এ প্রসঙ্গে এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন হাসান ইবনে আলীকে চুমু খেলেন, সেখানে আকরা ইবনে হাবিস (রা.) ছিলেন। তিনি বললেন, আমার ১০টি সন্তান আছে, আমি কখনো তাদের চুম্বন করিনি। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার দিকে তাকিয়ে বললেন, যে দয়া করে না; তার ওপর দয়া করা হয় না।’ (বুখারি : ১৮০৮)
সন্তানকে কোলে নেওয়া : রাত-দিনের চক্রাকারে মাঝেমধ্যে সন্তানকে কোলে নেওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ সন্তান ও অন্যান্য শিশুদেরও মাঝেমধ্যে কোলে নিতেন। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, উম্মুল কায়েস বিনতে মিহসান তার এমন একজন ছোট সন্তান নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এলেন, যে তখনো খাবার খেতে শিখেনি। রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুটিকে তাঁর কোলে বসালেন, তখন সে তার কাপড়ে প্রস্রাব করে দিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) পানি আনিয়ে তার ওপর ছিটিয়ে দিলেন; ধৌত করলেন না।’ (বুখারি : ২২৩)
দ্বীন শিক্ষা দেওয়া : আমাদের যাপিত জীবনে যত ভালো ও নেক কাজ করি না কেন, তাতে আমাদের কলিজার টুকরো সন্তানদেরও শরিক রাখা জরুরি। আমি দান-সদকা করলে বা সালাত-সিয়াম পালন করলে তাতে সন্তানকে শরিক রাখা দরকার। অনুরূপভাবে ইসলামের যেকোনো কাজে বা জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও সন্তানকে শরিক রাখা ভালো। আমল-আখলাক, আদব ও ইবাদত ইত্যাদি সব ভালো কাজে ও শিক্ষা-দীক্ষায় সন্তানকে সঙ্গে রাখলে এর সুফল দুনিয়াতেও মিলবে, পরকালেও মিলবে। বর্ণিত হয়েছে, ‘স্মরণ করুন ওই সময়ের কথা, যখন ইবরাহিম বাইতুল্লাহর ভিত উঁচু করছিল এবং ইসমাঈলও (তার কাজে শরিক ছিল এবং তারা বলছিল) হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পক্ষ থেকে এ সেবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি এবং কেবল আপনিই সবকিছু শোনেন ও সবকিছু জানেন’ (সুরা বাকারা : ১২৭)।
একটু ভাবুন, ইবরাহিম (আ.) কাবা শরিফ নির্মাণ কাজে আপন পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কীভাবে শরিক রেখেছিলেন! অন্যদিকে লোকমান (আ.) তার পুত্রকে নামাজ ও ইসলামের মৌলিক কিছু বিষয় শিক্ষা দিতে বললেন। যেমন, ‘হে বৎস! নামাজ কায়েম করো, মানুষকে সৎকাজের আদেশ করো, মন্দ কাজে বাধা দাও এবং তোমার যে কষ্ট দেখা দেয়, তাতে সবর করো। নিশ্চয়ই এটা অনেক হিম্মতের কাজ’ (সুরা লোকমান : ১৭)। এভাবে অনেক হাদিস থেকেই উপর্যুক্ত বিষয়টি প্রতীয়মান হয়। হজরত ওমর ইবনে আবু সালামাহ (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-এর তত্ত্বাবধানে ছিলাম। খাবার পাত্রে আমার হাত চারপাশে ঘুরত। তিনি বললেন বালক! তুমি বিসমিল্লাহ বলে খাও, তোমার ডান হাতে খাও এবং নিজের সম্মুখ থেকে খাও। (মুসলিম : ৫১৬৪) অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হাসান ইবনে আলী (রা.) একবার একটি সদকার খেজুর মুখে দিলেন, তখন রাসুল (সা.) তাকে বললেন, এটা ফেলে দাও। তুমি কি জানো না আমাদের জন্য সদকার মাল হারাম? (বুখারি : ৩০৭২)। উপর্যুক্ত আয়াত ও হাদিস থেকে বোঝা যায় পিতা-মাতার জন্য আপন সন্তান-সন্ততিকে শৈশবকাল থেকেই নামাজ ও ইসলামের মৌলিক সব আমল শিক্ষা দেওয়া আবশ্যক। একজন খোদাভীরু সফল মুমিন বানানোও আবশ্যক। কারণ এর প্রভাব সন্তানের ওপর প্রতিফলিত হয়। আর তাই এটি শুধু একটি দায়িত্বই নয় বরং একটি ইবাদতও।
Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © 2021
Design By Rana